শেয়ার বাজার থেকে আয় করতে চান? সঠিক শেয়ার নির্বাচন ও ট্রেডিং কৌশল

 

আপনি কি শেয়ার বাজার থেকে ইনকাম করার কথা ভাবছেন, কিন্তু ভয় পাচ্ছেন কোথা থেকে শুরু করবেন? সত্যি বলতে, সঠিক নিয়ম আর একটু ধৈর্য থাকলে শেয়ার মার্কেট মোটেও কঠিন কোনো জায়গা নয়।

শেয়ার-বাজার-থেকে-আয়

আপনি যদি না বুঝে হুটহাট টাকা ঢালেন তবে লস হবে, কিন্তু বুঝে-শুনে এগোল ভালো আয় করা সম্ভব। চলুন জেনে নেই, কীভাবে একাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে সঠিক শেয়ার চিনে নিয়মিত ইনকাম করা যায়।

পেজ সূচিপত্রঃ শেয়ার বাজার থেকে আয় করতে চান? সঠিক শেয়ার নির্বাচন ও ট্রেডিং কৌশল

শেয়ার বাজার কি এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

খুব সহজ ভাষায় বুঝেন, শেয়ার বাজার হলো এমন একটা জায়গা যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির ছোট ছোট অংশ বা ‘শেয়ার’ কেনাবেচা হয়। মনে করুন, আপনার এক বন্ধু একটি চায়ের দোকান শুরু করতে চায় এবং তার মোট খরচ হবে ১০,০০০ টাকা। তার কাছে ৮,০০০ টাকা আছে, বাকি ২,০০০ টাকার জন্য সে আপনাকে বলল "তুই আমাকে ২,০০০ টাকা দে, দোকানের ২০% মালিকানা তোর।" 

দোকানটা যদি পরে খুব ভালো চলে এবং অনেক লাভ করে, তবে আপনার ওই ২০% শেয়ারে লাভ চলে আসবে, আবার আপনি চাইলে আপনার অংশটি অন্য কারো কাছে ৩,০০০ টাকায় বিক্রিও করে দিতে পারেন। ঠিক একইভাবে, বড় বড় কোম্পানিগুলো ব্যবসা বাড়াতে শেয়ার বাজারে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলে এবং আমরা টাকা দিয়ে সেই কোম্পানির ছোটখাটো মালিক হয়ে যাই, কোম্পানি ভালো করলে আমাদের লাভ, আর খারাপ করলে লস।

শেয়ার বাজার কোথায় এবং কীভাবে পরিচালিত হয়?

শেয়ার বাজার কিন্তু কোনো সাধারণ কাঁচা বাজার বা শপিং মল নয়, যেখানে আপনি সরাসরি হেঁটে গিয়ে ব্যাগ হাতে জিনিসপত্র কিনে নিবেন। এটি মূলত একটি ডিজিটাল বা অনলাইন ব্যবস্থা, যা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে যেমন দুটি প্রধান শেয়ার বাজার আছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)।

সহজ একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলছি, মনে করুন আপনি একটি নতুন স্মার্টফোন কিনবেন। আপনি কিন্তু সরাসরি স্যামসং বা অ্যাপল কোম্পানিতে যান না, বরং কোনো অফিশিয়াল শোরুম বা বিশ্বস্ত দোকান থেকে ফোনটি কিনেন। শেয়ার বাজারের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি, আপনাকে সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে যেতে হয় না, মাঝখানে 'ব্রোকার হাউস' নামে অনুমোদিত কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে।

আরো পড়ুনঃ  দিনে ৫০০ টাকা ইনকাম করার অ্যাপ

আপনি যখন ব্রোকার হাউসের অ্যাপ বা তাদের মাধ্যমে কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার নির্দেশ দেন, তারা সেটি ডিজিটালভাবে স্টক এক্সচেঞ্জে পাঠিয়ে দেয়। পুরো সিস্টেমটি সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা (যেমন বাংলাদেশে (BSEC) খুব কড়া নজরদারিতে রাখে, যাতে কোনো প্রকার প্রতারণা বা জালিয়াতি না হতে পারে। ফলে আপনার কেনা শেয়ার সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।

শেয়ার বাজার থেকে আয় করার প্রধান উপায়গুলো কি কি?

শেয়ার বাজারে টাকা খাটানোর কথা ভাবলেই অনেকে মনে করেন শুধু শেয়ারের দাম বাড়লেই বুঝি লাভ হয়। কিন্তু বিষয়টি একদমই তা নয়, এখানে প্রধানত দুটি ভিন্ন উপায়ে আপনার পকেটে টাকা আসতে পারে। আপনি অল্প সময়ের জন্য লেনদেন করবেন নাকি লম্বা সময়ের জন্য টাকা রেখে দেবেন, তার ওপর নির্ভর করে আয়ের পথ।

মনে করুন, আপনি ৫০ টাকা দিয়ে একটি কোম্পানির শেয়ার কিনলেন এবং কিছুদিন পর সেটি ৭০ টাকায় বিক্রি করে দিলেন, এই যে বাড়তি ২০ টাকা লাভ হলো, এটাকে বলা হয় 'ক্যাপিটাল গেইন'। আর যদি আপনি শেয়ারটি বিক্রি না করে বছরের পর বছর রেখে দেন, তবে কোম্পানি তাদের বছরের লাভ থেকে আপনাকে যে বোনাস বা লাভ দেবে, সেটাকে বলে 'ডিভিডেন্ড'। 

নিচে এই দুটি উপায়ের পার্থক্য ও ধরণ সহজে  তুলে ধরা হলো:

আয়ের উপায় কীভাবে আয় হয়? ঝুঁকি কেমন? কার জন্য উপযুক্ত?
১. ক্যাপিটাল গেইন (ট্রেডিং) কম দামে শেয়ার কিনে বেশি দামে বিক্রি করে ঝুঁকি কিছুটা বেশি নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ করতে পারেন
২. ডিভিডেন্ড (ইনভেস্টিং) কোম্পানির বার্ষিক লাভ থেকে অংশ বা বোনাস পেয়ে ঝুঁকি বেশ কম যারা দীর্ঘমেয়াদে জমানো টাকা নিরাপদ রাখতে চান

আপনি তাড়াতাড়ি লাভ করতে চাইলে শেয়ার কেনাবেচা বা ট্রেডিংয়ের দিকে যেতে পারেন। আর যদি কোনো ঝামেলা ছাড়া ব্যাংকের এফডিআর এর চেয়ে ভালো রিটার্ন চান, তবে ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদে টাকা খাটিয়ে ডিভিডেন্ড থেকে নিয়মিত প্যাসিভ ইনকাম করতে পারেন।

শেয়ার বাজারে কাজ শুরু করতে কী কী প্রয়োজন?

বিষটা বুঝেন, শেয়ার বাজারে কাজ শুরু করা কিন্তু কঠিন কোনো কাজ না, ঠিক যেমন ব্যাংকে একটা নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ, এটাও তেমনই। তবে হুট করে বাজারে নেমে পড়ার আগে আপনার কিছু বেসিক জিনিসপত্র এবং কাগজপত্র রেডি রাখতে হবে। সব জিনিস গুছিয়ে নিলে আপনি নিজের ঘরে বসেই মোবাইলের মাধ্যমে কেনাবেচা শুরু করতে পারবেন।

সহজ একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, মনে করুন আপনি বিকাশ বা রকেট অ্যাকাউন্ট খুলতে চান। তখন যেমন আপনার (NID) কার্ড, নিজের নামে একটা সিম আর পাসপোর্ট সাইজ ছবি লাগে, ঠিক একইভাবে শেয়ার বাজারে নামার জন্যও কয়েকটি নির্দিষ্ট জিনিস লাগে। নিচে দেওয়া হলো আপনার ঠিক কী কী লাগবে:

  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): আপনার বয়স অবশ্যই ১৮ বছর বা তার বেশি হতে হবে এবং নিজের NID থাকতে হবে।
  • নিজের ব্যাংক একাউন্ট: আপনার নিজের নামে যেকোনো ব্যাংকে একটি একটিভ একাউন্ট থাকতে হবে, কারণ আয়ের সব টাকা এই ব্যাংকেই আসবে।
  • ছবি ও নমিনি: আপনার ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং আপনি যাকে নমিনি বানাবেন তার NID ও ছবি লাগবে।
  • স্মার্টফোন বা কম্পিউটার: শেয়ার কেনাবেচার জন্য একটি ভালো স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ লাগবে।

বিও (BO) একাউন্ট কি এবং কীভাবে ঘরে বসে একাউন্ট খুলবেন?

ভাবছেন বিও একাউন্ট কি? বিও (BO) হলো ‘Beneficiary Owner’ একাউন্ট। ব্যাংক একাউন্টে যেমন আপনি টাকা জমা রাখেন বা তোলেন, ঠিক তেমনি শেয়ার বাজারে কেনা সব শেয়ার জমা রাখার ডিজিটাল ওয়ালেট হলো এই বিও একাউন্ট। এই অ্যাকাউন্ট ছাড়া আপনি শেয়ার বাজারে কোনো শেয়ার কিনতে বা বেচতে পারবেন না।

মনে করুন, বিকাশ বা রকেটে টাকা রাখার জন্য যেমন একটা ডিজিটাল ওয়ালেট থাকে, বিও একাউন্ট হলো আপনার কেনা কোম্পানির শেয়ারগুলো নিরাপদ রাখার ডিজিটাল সিন্দুক। আপনি যখনই কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনবেন, তা এই একাউন্টে জমা হবে, আর বিক্রি করলে এখান থেকেই কেটে নেওয়া হবে।

এখন আর বিও একাউন্ট খুলতে কোনো ব্রোকার হাউসে গিয়ে লাইন ধরতে হয় না, মোবাইল দিয়েই খোলা যায়। অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার NID, ব্যাংক ডিটেইলস ও ছবি আপলোড করে অল্প কিছু ফি দিলেই ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে আপনার একাউন্ট চালু হয়ে যাবে। একাউন্ট হয়ে গেলে আপনি অ্যাপেই একটি ইউনিক আইডি পাবেন, যা দিয়ে লগইন করে কাজ শুরু করা যাবে। 

শেয়ার-বাজার-থেকে-আয়

শেয়ার বাজারে কীভাবে শেয়ার কেনাবেচা করতে হয়?

আপনার বিও একাউন্ট চালু হয়ে গেলে শেয়ার কেনাবেচা করা একদমই সহজ, ঠিক যেমন যেকোনো অনলাইন শপিং অ্যাপ থেকে পছন্দের জিনিস অর্ডার করা। এখন আর আগের মতো ব্রোকার হাউসে গিয়ে চিৎকার করে বা কাগজে লিখে শেয়ার কিনতে হয় না। পুরো কাজটাই আপনি আপনার স্মার্টফোনের অ্যাপ দিয়ে ঘরে বসে নিজেই করতে পারবেন।

সহজ একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, মনে করুন আপনি দারাজ বা অন্য কোনো অ্যাপে পণ্য কেনাকাটা করছেন। অ্যাপে গিয়ে যেমন প্রোডাক্টের নাম সার্চ করেন, দাম পছন্দ হলে কার্ডে যোগ করেন আর 'Buy' বাটনে চাপ দেন, শেয়ার বাজারের ট্রেডিং অ্যাপগুলোতেও ঠিক একইভাবে কাজ হয়। সেখানে কোম্পানির নাম সার্চ করে কতটি শেয়ার কিনতে চান এবং কত দামে কিনতে চান তা লিখে ক্লিক করলেই অর্ডার চলে যায়।

আরো পড়ুনঃ নতুনদের জন্য আপওয়ার্ক চাকরি

প্রথমে ব্রোকার হাউসের দেওয়া অ্যাপটি ফোনে ইনস্টল করে আপনার একাউন্টে সাইন-ইন করতে হবে। এরপর আপনার নিজের ব্যাংক একাউন্ট থেকে বিকাশ বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিও একাউন্টে টাকা পাঠাতে হবে। একাউন্টে টাকা জমা হলেই আপনি বাজারের চাল চলন দেখে পছন্দমতো শেয়ার কেনাবেচা করা শুরু করে দিতে পারবেন।

​আয় করতে সঠিক শেয়ার নির্বাচন করবেন যেভাবে?

আপনি ‍যদি লাভ করতে চান তাহলে একটা বিষয় মনে রাখবেন, শেয়ার বাজারে লাভ করতে হলে সব কোম্পানির শেয়ারে হাত দেওয়া যাবে না, বেছে বেছে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে। একটি দুর্বল কোম্পানিতে টাকা ঢাললে যেমন লসের ঝুঁকি থাকে, তেমনি একটি ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিতে টাকা খাটালে সময়ের সাথে সাথে ভালো লাভ পাওয়া যায়।

ধরুন আপনি একটি আম বাগান কিনতে চাচ্ছেন। আপনি নিশ্চয়ই এমন একটি বাগান বেছে নেবেন যেটার গাছগুলো সুস্থ, প্রতি বছর প্রচুর ভালো আম দেয় এবং যার মালিক খুব সৎ ও পরিশ্রমী। শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও বিষয় একই, আপনাকে এমন সব কোম্পানির শেয়ার কিনতে হবে যাদের ব্যবসা দিন দিন বড় হচ্ছে এবং নিয়মিত ভালো লাভ করছে।

ভালো শেয়ার চেনার জন্য বেশি জটিল কিছু জানার প্রয়োজন নেই, শুধু ৩টি বেসিক বিষয় খেয়াল রাখলেই হয়। প্রথমত, কোম্পানির ব্যবসা এবং তারা প্রতি বছর লাভ করছে কিনা তা দেখা দ্বিতীয়ত, তাদের পিই রেশিও (P/E Ratio) বা মূল্যায়নের অবস্থা দেখে নেওয়া এবং তৃতীয়ত, তাদের ওপর দেনা বা ঋণের পরিমাণ খুব বেশি আছে কিনা তা যাচাই করে নেওয়া।

ট্রেডিং করে দ্রুত আয়ের সেরা কৌশল

শেয়ার বাজারে শর্ট-টার্ম বা প্রতিদিন কেনাবেচা করে দ্রুত টাকা আয় করার নামই হলো ট্রেডিং। তবে কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়া আন্দাজে টাকা ঢাললে লাভের বদলে লস হওয়ার ঝুঁকিটাই বেশি থাকে। তাই ট্রেডিং থেকে নিয়মিত ও দ্রুত লাভ বের করে আনতে নিচের প্র্যাকটিক্যাল ধাপগুলো মেনে চলা উচিত:

  • ভালো কোম্পানি কিন্তু সাময়িক দাম কমেছে এমন শেয়ার ধরাঃ বাজারে কিছু শক্তিশালী কোম্পানি থাকে যেগুলোর মূল ব্যবসার অবস্থা বেশ ভালো, কিন্তু সাময়িক কোনো খবরের কারণে দর কিছুটা কমে যায়। যেমন: একটি ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম হঠাৎ ১০০ টাকা থেকে কমে ৮০ টাকায় নেমে এলো। অভিজ্ঞ ট্রেডাররা এই ধরনের সুযোগের অপেক্ষাতেই থাকেন এবং সঠিক সময়ে এন্ট্রি নেন।
  • সাপোর্ট ও রেজিস্ট্যান্স লেভেল দেখে কেনাবেচা করাঃ 'সাপোর্ট' হলো শেয়ারের দামের এমন একটি তলা যেখান থেকে দাম সচরাচর আর নিচে নামে না, বরং ওপরে উঠতে থাকে। আর 'রেজিস্ট্যান্স' হলো এমন একটি ছাদ যেখানে গিয়ে দাম আটকে যায় বা নিচে নেমে আসে। মেঝের কাছাকাছি দামে শেয়ার কিনে ছাদের কাছাকাছি দামে বিক্রি করে দেওয়াই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
  • স্টপ লস ব্যবহার করে রিস্ক কমানোঃ ​ট্রেডিংয়ে আপনি প্রতিবার লাভ করবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, তাই লস ঠেকানোর প্রস্তুতি আগে থেকেই রাখতে হবে। যেমন: আপনি ১০০ টাকায় একটি শেয়ার কিনে ৯৫ টাকায় 'স্টপ লস' সেট করে রাখলেন। এতে দাম হুট করে অনেক নিচে নেমে গেলেও আপনার লস ৫ টাকার বেশি হবে না, আর আপনি বড় ধরনের বিপদ থেকে বেঁচে যাবেন।
  • মার্কেট ট্রেন্ড বা বাজারের হাওয়া বুঝে ট্রেড করাঃ ​কথায় আছে, "Trend is your friend" অর্থাৎ বাজার যেদিকে যাচ্ছে আপনাকেও সেদিকেই হাঁটতে হবে। যখন পুরো শেয়ার বাজার ওপরের দিকে উঠতে থাকে (যাকে বুল মার্কেট বলে), তখন ট্রেড করলে লাভের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। বাজার যখন টানা পতন বা মন্দার মধ্যে থাকে, তখন শর্ট-টার্ম ট্রেডিং না করাই ভালো।
  • সুইং ট্রেডিং মেথড প্রয়োগ করাঃ সুইং ট্রেডিং মানে হলো কোনো শেয়ার কিনে ১ দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ বা ১ মাস ধরে রাখা এবং দাম কিছুটা বাড়লেই বিক্রি করে দেওয়া। দিনে দিনে শেয়ার কেনাবেচা (ডে ট্রেডিং) করার চেয়ে এই সুইং ট্রেডিং নতুনদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ এবং এতে কম মানসিক চাপ নিয়ে তাড়াতাড়ি আয় করা যায়।
  • নির্দিষ্ট লাভে শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যাওয়াঃ ​ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো 'লোভ'। ৮০ টাকায় কেনা শেয়ারের দাম যখন ৯৫ টাকা হয়ে যায়, তখন অনেকে ভাবেন দাম হয়তো আরও বাড়বে এবং বিক্রি না করে বসে থাকেন, কিন্তু বাজার পরদিনই উল্টো ঘুরে নিচে নেমে যায়। তাই ছোট কিন্তু নির্দিষ্ট লাভ হলেই লোভ ধরে না রেখে তা পকেটে পুরে ফেলাই সফল ট্রেডারের লক্ষণ।
  • নিজের ইমোশন বা ভয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখাঃ শেয়ারের দাম একটু কমলেই ভয়ে তাড়াহুড়ো করে লসে বিক্রি করে দেওয়া কিংবা দাম হুহু করে বাড়তে দেখলে না বুঝে লোভে পড়ে কেনা, এই দুটি ভুলই ট্রেডিংয়ের প্রধান শত্রু। ইমোশন বাদ দিয়ে একদম ঠান্ডা মাথায় নিয়মনীতি ও চার্ট দেখে কেনাবেচা করতে পারলে ট্রেডিং থেকে নিয়মিত একটা ভালো সাইড ইনকাম বের করা সম্ভব।

ডিভিডেন্ড থেকে আজীবন প্যাসিভ ইনকাম পাওয়ার উপায়

আপনি যদি শেয়ার বাজারের পেছনে প্রতিদিন সময় দিতে না পারেন, তবুও প্রতি বছর কোনো খাটুনি ছাড়াই নিয়মিত ইনকাম করার দারুণ এক পথ হলো ‘ডিভিডেন্ড’ বা লভ্যাংশ। আপনি একটি ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনে রেখে দিলে কোম্পানি তাদের লাভ থেকে প্রতি বছর আপনাকে একটা নির্দিষ্ট অংশের টাকা দেবে। কীভাবে এই উপায়ে একটা স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করবেন:

ভালো ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানি খুঁজে বের করাঃ সব কোম্পানি তাদের লাভের টাকা শেয়ার হোল্ডারদের মাঝে ভাগ করে দেয় না, কিছু কোম্পানি পুরো টাকাই ব্যবসায় রেখে দেয়। আপনাকে এমন কিছু পুরানো ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি খুঁজে বের করতে হবে, যারা গত ৫-১০ বছর ধরে টানা তাদের লাভের বড় একটা অংশ নগদ টাকা  হিসেবে শেয়ার হোল্ডারদের দিয়ে আসছে।

মনে করুন, আপনার ব্যাংকে ১০ লাখ টাকা আছে এবং ব্যাংক আপনাকে বছরে ৬% অর্থাৎ ৬০,০০০ টাকা সুদ দেয়। এখন আপনি যদি এমন কোনো ভালো কোম্পানির শেয়ারে এই ১০ লাখ টাকা খাটান যারা প্রতি বছর ৭% ডিভিডেন্ড দেয়, তবে আপনি ঘরে বসেই বছরে ৭০,০০০ টাকা পাবেন। এর বড় সুবিধা হলো, সময়ের সাথে সাথে কোম্পানির শেয়ারের দামও বাড়বে এবং আপনার মূল টাকাটাও বড় হতে থাকবে।

রেকর্ড ডেট এর আগে শেয়ার কেনাঃ কোম্পানি যখন ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে, তখন তারা একটি ‘রেকর্ড ডেট’ বা নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে দেয়। নিয়ম হলো, ওই তারিখের দিন আপনার বিও (BO) একাউন্টে যদি কোম্পানির শেয়ার কেনা থাকে, তবেই আপনি ওই বছরের লাভের টাকা পাবেন। তাই ডিভিডেন্ডের টাকা পেতে হলে অবশ্যই রেকর্ড ডেটের আগেই শেয়ার কিনে রাখতে হবে।

ডিভিডেন্ড রি-ইনভেস্টমেন্ট কৌশলঃ লভ্যাংশ হিসেবে পাওয়া টাকাটা পকেটে না পুরে যদি আবার নতুন করে সেই একই কোম্পানির শেয়ার কেনা যায়, তবে অলৌকিক ঘটনা ঘটে! একে বলা হয় 'কম্পাউন্ডিংয়ের জাদু'। প্রথম বছরের পাওয়ার ডিভিডেন্ড দিয়ে নতুন শেয়ার কিনলে পরের বছর আয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে, যা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আপনার মূলধনকে বহুগুণ বড় করে দেবে।
(Blue-Chip) কোম্পানিতে লং-টার্ম ইনভেস্ট করাঃ শেয়ার বাজারে ডিভিডেন্ডের জন্য বিনিয়োগ করতে চাইলে দুর্বল বা নতুন কোম্পানিতে টাকা ফেলা একদমই উচিত না। দেশের সেরা ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে ‘ব্লু-চিপ কোম্পানি’ বলা হয়। এসব কোম্পানি বাজারে বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকে এবং মন্দার সময়েও ব্যবসা ধরে রেখে শেয়ার হোল্ডারদের নিয়মিত ডিভিডেন্ড দিয়ে থাকে।

একাধিক ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানিতে পোর্টফোলিও ভাগ করাঃ সব টাকা শুধু একটি কোম্পানিতে না খাটিয়ে বিভিন্ন খাতের ৪-৫টি ভালো কোম্পানিতে ভাগ করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন: ব্যাংক, ফার্মাসিউটিক্যালস বা টেলিকম খাতের শীর্ষে থাকা কোম্পানিগুলোতে টাকা ভাগ করে রাখলে ঝুঁকি অনেক কমে যায় ও নিয়মিত প্যাসিভ ইনকাম নিশ্চিত হয়।
শেয়ার-বাজার-থেকে-আয়

শেয়ার বাজারে সফল হতে যেসব ঝুঁকি ও ভুল এড়ানো উচিত

শেয়ার বাজার যেমন আয়ের জন্য দারুণ একটা জায়গা, তেমনি না বুঝে পা বাড়ালে এখানে বড় ধরনের লসের ঝুঁকিও থাকে। অনেক নতুন বিনিয়োগকারী না বুঝে মানুষের কথায় কান দিয়ে হুটহাট শেয়ার কিনে ফেলেন এবং পরবর্তীতে দাম কমে গেলে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে ফেলেন। শেয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থেকে ভালো লাভ করতে হলে কিছু কমন ভুল ও ঝুঁকি শুরুতেই সচেতনভাবে এড়িয়ে চলা উচিত।

একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝলে ভালো হয়, মনে করুন আপনি কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই গভীর পানিতে সাঁতার কাটতে নেমে গেলেন। সাঁতার না জেনে যেমন পানিতে নামলে ডুবে যাওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে, ঠিক তেমনি বাজার সম্পর্কে না জেনে অন্য কারও আশ্বাসে টাকা ঢাললে ক্যাপিটাল হারানোর ভয় থাকে। তাই গুজবে কান না দিয়ে এবং বন্ধুদের কথামতো শেয়ার না কিনে সবসময় নিজের বুদ্ধি ও বাজার যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আরেকটি বড় ভুল হলো নিজের জমানো সব টাকা বা ঋণ নিয়ে একটি মাত্র কোম্পানির শেয়ারে খাটিয়ে ফেলা। বাজার যদি কোনো কারণে খারাপ যায়, তবে ওই একটি ভুলের কারণে আপনার পুরো টাকাই আটকে যেতে পারে। তাই সবসময় আলাদা আলাদা খাতের ৩-৪টি ভালো কোম্পানিতে টাকা ভাগ করে বিনিয়োগ করবেন এবং কোনো অবস্থাতেই সুদে ঋণ নিয়ে শেয়ার বাজারে ব্যবসা করতে আসবেন না।

শেয়ার বাজার থেকে আয় সর্ম্পকে কিছু প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্নঃ শেয়ার বাজারে কাজ শুরু করতে সর্বনিম্ন কত টাকা লাগে?
উত্তরঃ শেয়ার বাজারে কাজ শুরু করতে নির্দিষ্ট কোনো বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয় না। আপনি মাত্র ১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকা দিয়েই বিও একাউন্ট খুলে প্রথম শেয়ার কেনা শুরু করতে পারেন।

প্রশ্নঃবিও (BO) একাউন্ট খুলতে কী কী কাগজপত্র লাগে?
উত্তরঃ বিও একাউন্ট খুলতে আপনার NID কার্ড, ব্যাংক একাউন্টের তথ্য, নিজস্ব পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং নমিনির NID ও ছবি লাগে। এই কাগজপত্রগুলো থাকলে আপনি ঘরে বসে মোবাইল দিয়েই বিও একাউন্ট খুলতে পারবেন।

প্রশ্নঃ শেয়ার বাজারে কি প্রতিদিন সময় দিতে হয়?
উত্তরঃ আপনি যদি ট্রেডিং বা প্রতিদিন কেনাবেচা করতে চান, তবে আপনাকে প্রতিদিন বাজার পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবে আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদে ভালো কোম্পানিতে ডিভিডেন্ডের জন্য বিনিয়োগ করেন, তবে প্রতিদিন সময় দেওয়ার কোনো দরকার নেই।

প্রশ্নঃ শেয়ার বাজার কি কোনো জুয়া বা লটারি?
উত্তরঃ না, শেয়ার বাজার একদমই জুয়া বা লটারি নয়; এটি পুরোপুরি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা।কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও ব্যবসার গতি দেখে সঠিক বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে এখানে সফল হতে হয়।

প্রশ্নঃ স্টুডেন্টরা কি শেয়ার বাজারে কাজ বা বিনিয়োগ করতে পারবে?
উত্তরঃ হ্যাঁ, অবশ্যই পারবে! বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি হলে এবং  (NID) কার্ড থাকলে যেকোনো ছাত্র-ছাত্রী শেয়ার বাজারে একাউন্ট খুলতে পারবে। এমনকি পড়ালেখার পাশাপাশি অল্প টাকা জমিয়ে এখান থেকে ভবিষ্যতের জন্য একটি ভালো ফান্ড তৈরি করা সম্ভব।

প্রশ্নঃ শেয়ার কিনলে লস হওয়ার সম্ভাবনা কি বাদ দেওয়া যায়?
উত্তরঃ শেয়ার বাজারে পুরোপুরি ১০০% লসমুক্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এটি একটি স্বাভাবিক ব্যবসা। তবে ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদে টাকা খাটালে এবং 'স্টপ লস' ব্যবহার করলে লসের ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।

প্রশ্নঃ শেয়ার বেচার পর সেই টাকা কত দিনে নিজের ব্যাংকে আসে?
উত্তরঃ শেয়ার বিক্রি করার পর সেটি সেটেলমেন্ট হতে সাধারণত 'T+2' বা দুই কর্মদিবস সময় লাগে।
দুই দিন পর টাকা আপনার বিও একাউন্টে অ্যাভেলেবল হলে আপনি সরাসরি নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে নিতে পারবেন।

প্রশ্নঃ বিও একাউন্টের বাৎসরিক মেইনটেন্যান্স ফি কত?
উত্তরঃ বাংলাদেশে একটি বিও একাউন্ট চালু রাখার জন্য সাধারণত বছরে ৪৫০ টাকা মেইনটেন্যান্স ফি দিতে হয়। এই ফিটি প্রতি বছর আপনার বিও একাউন্টের ব্যালেন্স থেকে সরাসরিভাবে কেটে নেওয়া হয়।

প্রশ্নঃ ভালো কোম্পানি বা শেয়ার কীভাবে চিনবো?
উত্তরঃ যেসব কোম্পানির প্রতি বছর লাভ বাড়ছে, বাজারে দেনা কম এবং নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেয় সেগুলোই মূলত ভালো কোম্পানি। এছাড়া যে সব কোম্পানির তৈরি পণ্যর চাহিদা বাজারে সবসময় থাকে, সেগুলোর শেয়ার কেনা নিরাপদ।

প্রশ্নঃ পার্ট-টাইম কাজ বা চাকরি করার পাশাপাশি কি এটি করা সম্ভব?
উত্তরঃ হ্যাঁ, এটি চাকরি বা যেকোনো পেশার পাশাপাশি পার্ট-টাইম হিসেবে করা একদমই সহজ। আপনি রাতে বা অবসর সময়ে বাজার বিশ্লেষণ করে অর্ডার দিয়ে রাখতে পারেন অথবা ভালো শেয়ার কিনে দীর্ঘমেয়াদে ফেলে রেখে নিশ্চিন্তে চাকরি চালিয়ে যেতে পারেন।

শেয়ার বাজার থেকে আয় সর্ম্পকে লেখকের শেষকথা

এতক্ষণ শেয়ার বাজার কী, কীভাবে একাউন্ট খুলতে হয়, কীভাবে সঠিক শেয়ার বেছে নিতে হয় এবং এখান থেকে ট্রেডিং ও ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে আয় করার উপায়গুলো নিয়ে আমরা যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছি আশা করি তা আপনারা খুব সহজেই বুঝতে পেরেছেন। শেয়ার বাজার কোনো জাদুকরী উপায়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার জায়গা নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও ধৈর্য ধরে এগোনোর বিজনেস।

সঠিক শিক্ষা, ঠান্ডা মাথায় ধৈর্য ধরা এবং নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ করার মানসিকতা থাকলে শেয়ার বাজার হতে পারে আপনার জন্য আয়ের অন্যতম সেরা ও নিরাপদ মাধ্যম। তাই আজই ভয় দূর করে শিখতে শুরু করুন, ছোট পদক্ষেপে শুরু করে নিজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের যাত্রা শুরু করুন ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

টিপস পয়েন্ট আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url