সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা আবেদন : নিয়ম ও খরচ ২০২৬
যেসকল ভাই ও বোনেরা সৌদি আরবের কোম্পানিতে যেতে চাচ্ছেন এবং ২০২৬ সালে কোন কোন পদে কোন কোন কোম্পানিতে যাওয়া যাবে, কিভাবে যাবেন, ভিসার আবেদনের নিয়ম, কি কি কাগজপত্র এবং খরচ কত তা সর্ম্পকে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
চলুন জেনে নেই, ২০২৬ সালে সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা আবেদন করতে কি কি নিয়ম ও খরচ প্রয়োজন বিস্তারিত।
পেজ সূচিপত্রঃ সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা আবেদন : নিয়ম ও খরচ ২০২৬
- সৌদি আরব কোম্পানি ভিসা কি?
- সৌদি কোম্পানি ভিসায় আবেদনের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- সৌদি আরব কোম্পানি ভিসার বেতন কত হয়?
- ২০২৬ সালে সৌদি আরবের কোন কোন কোম্পানিতে যাওয়া যায়?
- সৌদি কোম্পানি ভিসায় কোন কোন পদে কাজের চাহিদা বেশি
- আলমারাই কোম্পানিতে কোন কোন পদে যাওয়া যায়
- সরকারিভাবে কোম্পানি ভিসায় যেতে কত টাকা লাগে?
- বেসরকারিভাবে বা এজেন্সির মাধ্যমে কোম্পানি ভিসা খরচ
- অনলাইনে সৌদি আরব কোম্পানি ভিসা চেক করার উপায়
- কোম্পানি ভিসায় সৌদি আরব যাওয়ার আগে সতর্কতা
- সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা আবেদন সর্ম্পকে কিছু প্রশ্ন
- সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা আবেদন সর্ম্পকে লেখকের শেষকথা
সৌদি আরব কোম্পানি ভিসা কি?
সৌদি আরবের কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান যখন বাইরে থেকে কর্মী নেওয়ার জন্য ভিসা ইস্যু করে, সেটিকে কোম্পানি ভিসা বলা হয়। এই ভিসায় আপনি নির্দিষ্ট একটি কোম্পানিতে একদম চুক্তিভাবে কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবেন, যেখানে থাকার জায়গা ও আকামা সর্ম্পকে বেশ কিছু সুবিধাও থাকে। ফ্রি ভিসার মতো নিজে কাজ খোঁজার ঝুঁকি না থাকায় বর্তমানে প্রবাসীদের কাছে কোম্পানি ভিসার চাহিদা অনেক বেশি।
কোম্পানি ভিসার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এতে বেতন ঠিক সময়ে পাওয়া যায় এবং কাজের একটা স্থায়ী নিশ্চয়তা থাকে। আপনি যে পদে ও যে চুক্তিতে আসবেন, কোম্পানি আপনাকে আইন অনুযায়ী সেই দায়িত্ব এবং চুক্তি অনুযায়ী সব সুবিধা দিতে বাধ্য থাকবে। তাই দালালের ঝামেলা ছাড়া নিরাপদে বিদেশে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে এই ভিসা নিঃসন্দেহে অনেক ভালো একটি সিদ্ধান্ত।
সৌদি কোম্পানি ভিসায় আবেদনের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসায় আবেদনের প্রক্রিয়াটি বেশ কিছু ধাপের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে ১থেকে ৩ মাস সময় লাগে। আপনার বোঝার সুবিধার্থে সম্পূর্ণ নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিচে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেওয়া হলো:
ভিসা আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রঃ
- মূল পাসপোর্ট: কমপক্ষে ৬ মাসের মেয়াদ থাকতে হবে।
- ছবি: সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের পাসপোর্ট সাইজ ছবি (সাধারণত ৪-৬ কপি)।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): মূল কপি ও ফটোকপি।
- মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট: অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে রিপোর্ট।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ: কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, এমন সত্যতা প্রমাণ করার জন্য।
- শিক্ষাগত ও দক্ষতার সনদ: (যদি কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়)।
আরো পড়ুনঃ বিদেশ থেকে বিকাশে টাকা আসতে কত দিন সময় লাগে?
ধাপে ধাপে আবেদনের সহজ নিয়মঃ
জব সার্কুলার খোঁজা ও বাছাই: সরকারি (যেমন: BOESL) বা অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির সার্কুলার থেকে আপনার দক্ষতার সাথে মিলে এমন পদ খুঁজে নিন। সৌদি আরবের কোম্পানির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ও সার্কুলার দেখতে পারেন।
আবেদন ও কাগজপত্র জমা: নির্ধারিত ফরম পূরণ করে পাসপোর্ট, ছবি ও সনদের ফটোকপি এজেন্সিতে বা অনলাইনে জমা দিন।
ইন্টারভিউ দেওয়া: কোম্পানি থেকে প্রতিনিধি আসলে বা অনলাইনে (Zoom/Google Meet) দক্ষতার ওপর ইন্টারভিউ দিন।
মেডিকেল টেস্ট: ইন্টারভিউতে টিকলে নির্দিষ্ট 'GAMCA' অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে শারীরিক পরীক্ষা করান।
ভিসা প্রসেসিং ও ইস্যু: মেডিকেল ফিট এলে পাসপোর্ট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দূতাবাসে জমা দিয়ে ভিসা স্ট্যাম্পিং বা ইস্যু করিয়ে নিন।
সৌদি আরব কোম্পানি ভিসার বেতন কত হয়?
সৌদি আরবে কোম্পানি ভিসায় মূল বেতন কত হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার কাজের ধরন, অভিজ্ঞতা এবং কোম্পানির উপর। সাধারণ লেবার বা ক্লিনারদের চেয়ে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও ড্রাইভারদের বেতন অনেক বেশি হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের বর্তমানে কোম্পানি ভিসায় গড়ে ৮০০ রিয়াল থেকে শুরু করে ৩,০০০ রিয়ালের বেশি পর্যন্ত আয় করা সম্ভব, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫,০০০ টাকা থেকে ১,০০,০০০ টাকারও বেশি।
জনপ্রিয় কয়েকটি পদের আনুমানিক বেতন ও অন্যান্য সুবিধার একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| পদের নাম (কাজের ধরন) | আনুমানিক মাসিক বেতন (SAR) | আনুমানিক বাংলাদেশি টাকা (BDT) | কোম্পানির বিশেষ সুযোগ-সুবিধা |
|---|---|---|---|
| সাধারণ শ্রমিক / ক্লিনার | ৮০০ - ১,২০০ রিয়াল | ২৬,০০০ - ৩,৯,০০০ টাকা | ফ্রি থাকা + কোম্পানির নিজস্ব আকামা |
| প্যাকেজিং ও ফ্যাক্টরি কর্মী | ১,০০০ - ১,৪০০ রিয়াল | ৩২,৫০০ - ৪৫,৫০০ টাকা | ওভারটাইম সুযোগ + থাকা ফ্রি |
| ইলেকট্রিশিয়ান / প্লাম্বার | ১,২০০ - ২,০০০ রিয়াল | ৩,৯,০০০ - ৬৫,০০০ টাকা | ওভারটাইম বোসাস + স্বাস্থ্য বীমা |
| হালকা ও ভারী ড্রাইভার | ১,৫০০ - ২,৫০০ রিয়াল | ৪৮,৭০০ - ৮১,২৫০ টাকা | ওভারটাইম + ফ্রি খাবার সুবিধা |
| মেকানিক / এসি টেকনিশিয়ান | ১,৫০০ - ২,৮০০ রিয়াল | ৪৮,৭০০ - ৯১,০০০ টাকা | চিকিৎসা সুবিধা + আকামা নবায়ন |
| ইঞ্জিনিয়ার / আইটি স্পেশালিস্ট | ৩,৫০০ - ৮,০০০+ রিয়াল | ১,১৩,৭৫০ - ২,৬০,০০০+ টাকা | ফ্যামিলি সুবিধা + বার্ষিক টিকেট |
অভিজ্ঞতা ও কাজের দক্ষতা থাকলে কোম্পানি ভেদে ১০%-২০% পর্যন্ত অতিরিক্ত বেতন পাওয়া যায়। এছাড়া সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত বড় কোম্পানিগুলো সাধারণত বিনামূল্যে ওভারটাইম, স্বাস্থ্য দিয়ে থাকে।
২০২৬ সালে সৌদি আরবের কোন কোন কোম্পানিতে যাওয়া যায়?
- আলমারাই কোম্পানিঃ সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় ডেইরি ও ফুড প্রোডাক্টস প্রতিষ্ঠান। এখানে ড্রাইভার, প্যাকেজিং, ক্লিনার, সেলসম্যান এবং ফ্যাক্টরি হেলপার পদে প্রতি বছরই প্রচুর কর্মী নিয়ে থাকে।
- বিন লাদেন গ্রুপঃ সৌদি আরবের শীর্ষ কনস্ট্রাকশন ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন বড় বড় প্রজেক্টে মেসন, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার ও সাধারণ লেবার পদে এখানে বিশাল নিয়োগ হয়ে থাকে।
- আল বাওয়ানিঃ সৌদি আরবের আরও একটি খ্যাতিমান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, সাইট সুপারভাইজর থেকে শুরু করে ভারী যন্ত্রপাতির অপারেটর ও নির্মাণ শ্রমিক পদে তারা লোক নেয়।
- নেসমা অ্যান্ড পার্টনার্সঃ তেল, গ্যাস ও অবকাঠামো খাতে কাজ করা একটি প্রথম সারির কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি। এখানে মেকানিক্যাল, টেকনিক্যাল এবং সেফটি অফিসারসহ দক্ষ টেকনিশিয়ানদের কাজের বড় সুযোগ থাকে।
- সৌদি অরামকো প্রজেক্টসঃ সরাসরি অরামকো ছাড়াও তাদের অধীনে সাব-কন্ট্রাক্টর কোম্পানিগুলোতে রিগ মেকানিক, পাইপ ফিটার, ওয়েল্ডার ও ক্রেন অপারেটর পদে প্রচুর কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
- সেফকোঃ পেট্রোকেমিক্যাল খাতের কোম্পানিগুলোতে রিফাইনারি লেবার, মেইনটেন্যান্স ক্রু এবং লোডিং-আনলোডিং হেলপার পদের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রচুর লোক নেওয়া হয়।
সৌদি কোম্পানি ভিসায় কোন কোন পদে কাজের চাহিদা বেশি
আলমারাই কোম্পানিতে কোন কোন পদে যাওয়া যায়
- সেলস ও ডেলিভারি ভ্যান ড্রাইভারঃ আলমারাইয়ের বিশাল ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করার জন্য ড্রাইভারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কোম্পানির দুধ, জুস, চিজ এবং বেকারি পণ্য নির্দিষ্ট সুপারমার্কেট বা দোকানে পৌঁছে দেওয়া। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং প্রাথমিক রুট চেনার দক্ষতা থাকতে হয়।
- অটোমোবাইল মেকানিক ও গ্যারেজ স্টাফঃ আলমারাই কোম্পানির নিজস্ব হাজার হাজার পরিবহন ভ্যান, লরি ও ট্রাক রয়েছে। এগুলো সবসময় সচল রাখতে তাদের বিশাল (ওয়ার্কশপ) রয়েছে।অটো মেকানিক, অটো ইলেকট্রিশিয়ান, ডেন্টার, পেইন্টার এবং টায়ার মেকানিক হিসেবে গাড়ির সার্ভিসিং ও মেরামতের কাজ করা।
- ফ্যাক্টরি হেলপার ও প্যাকেজিং কর্মীঃ কারখানায় সরাসরি কাজ করার জন্য কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে না। প্রোডাক্ট লেবেলিং করা, কার্টনে মালামাল গুছিয়ে রাখা, প্রসেসিং লাইনে সাহায্য করা এবং কোল্ড স্টোরেজে মালামাল লোডিং-আনলোডিং করা।
- সেলসম্যান ও মার্চেন্ডাইজারঃ যেসব কর্মীদের কিছুটা অভিজ্ঞতা ও সাধারণ ইংরেজি বা আরবি ভাষায় কথা বলার দক্ষতা আছে, তারা এই পদে সুযোগ পান। বড় বড় শপিং মল বা সুপারশপে আলমারাইয়ের পণ্যগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা, স্টক চেক করা এবং কাস্টমারকে সার্ভিস দেওয়া।
- ফার্ম ও ডেইরি হেলপারঃ আলমারাইয়ের নিজস্ব বিশাল গরুর খামার ও কৃষিজমি রয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য ও গবাদিপশু লালন-পালন করা হয়। খামারে দুধ দোহানো, পশুপালন, শেড পরিষ্কার রাখা এবং কৃষি যন্ত্রপাতি পরিচালনার কাজ।
সরকারিভাবে কোম্পানি ভিসায় যেতে কত টাকা লাগে?
- মেডিকেল ফি: আনুমানিক ৮,৫০০ – ৯,৫০০ টাকা।
- ভিসা প্রসেসিং ও স্ট্যাম্পিং ফি: ১০,০০০ – ১৫,০০০ টাকা।
- বিএমইটি (BMET) স্মার্ট কার্ড ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট: ৪,০০০ – ৫,০০০ টাকা।
- কল্যাণ বোর্ড ফি ও বিমা খরচ: ৪,০০০ – ৫,০০০ টাকা।
- বোয়েসেল সার্ভিস চার্জ: পদের ভিত্তিতে সরকার নির্ধারিত নামমাত্র সার্ভিস চার্জ।
- প্লেন টিকেট: অনেক সময় নিয়োগকারী সৌদি কোম্পানি নিজেই ফ্রি বিমান টিকেট প্রদান করে। কোম্পানি টিকেট না দিলে বিমান টিকেটের আসল দাম (৪০,০০০ – ৫০,০০০ টাকা) যুক্ত হয়।
বেসরকারিভাবে বা এজেন্সির মাধ্যমে কোম্পানি ভিসা খরচ
- ভিসার মূল দাম বা ফাইল প্রসেসিং: ২,৫০,০০০ – ৩,৫০,০০০ টাকা।
- মেডিকেল পরীক্ষা: ৮,৫০০ – ৯,৫০০ টাকা।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও পেপারস অ্যাটেস্টেশন: ৩,০০০ – ৫,০০০ টাকা।
- ভিসা স্ট্যাম্পিং ও এম্বাসি ফি: ১৫,০০০ – ২৫,০০০ টাকা।
- বিএমইটি (BMET) ট্রেনিং, স্মার্ট কার্ড ও ইন্স্যুরেন্স: ৫,০০০ – ৭,০০০ টাকা।
- ওয়ান-ওয়ে এয়ার টিকেট: ৪৫,০০০ – ৬০,০০০ টাকা (কোম্পানি টিকেট না দিলে)।
অনলাইনে সৌদি আরব কোম্পানি ভিসা চেক করার উপায়
- Searching for: অপশনে "Visa application number" বা "Visa number" সিলেক্ট করুন।
- Application Number: আপনার আবেদন নম্বরটি লিখুন।
- Passport Number: আপনার পাসপোর্ট নম্বরটি দিন।
- ক্যাপচা কোড দিন: স্ক্রিনে প্রদর্শিত ইমেজ ক্যাপচা কোডটি সঠিক ঘরে লিখুন।
- সার্চে ক্লিক করুন: সবশেষে "Perform Inquiry" বা "Search" বাটনে চাপ দিন।



টিপস পয়েন্ট আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url