পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ২০২৬ কত তারিখে এবং সরকারি ছুটি কবে?

ইসলাম ধর্মে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী এই দিনটি সর্ম্পকে প্রতি বছরই অনেকেই জানতে চান, বিশেষ করে ২০২৬ সালের ছুটির তারিখ ও ছুটি নিয়ে অনেকেই বিস্তারিত জানতে চান।

ঈদে-মিলাদুন্নবী

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ও জীবনের স্মৃতিনিয়ে এই বিশেষ দিনটি একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ এবং এই দিনে আমাদের করণীয় কী, তা জানা জরুরি। চলুন জেনে নেই, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর গুরুত্ব, ইতিহাস এবং ২০২৬ সালের সঠিক তারিখ সম্পর্কে বিস্তারিত।

পেজ সূচিপত্রঃ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ২০২৬ কত তারিখে এবং সরকারি ছুটি কবে?

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী কী এবং কেন পালন করা হয়?

ঈদে মিলাদুন্নবী কী? সহজ কথায় বলতে গেলে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমন বা জন্ম নেওয়ার পবিত্র দিনটিকে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ বলা হয়। আরবি ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্ম আর ‘নবী’ মানে বার্তা বাহক, অর্থাৎ সহজ কথায় এটি হলো আমাদের প্রিয় নবীর জন্মবৃত্তান্ত বা আগমনের আনন্দ। হিজরি রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে গোটা বিশ্বের মুসলমানরা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে এই বিশেষ দিনটি মনে রাখেন।

কেন পালন করা হয়? আমরা এই দিনটি পালন করি মূলত মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য, কারণ তিনি আমাদের প্রিয় নবীজীকে পরম রহমত হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। নবীজী (সা.) অন্ধকার যুগের সব অন্যায়-অবিচার দূর করে মানুষকে সঠিক পথ, শান্তি এবং সত্যের আলো দেখিয়েছিলেন। তাই তাঁর এই আগমনী দিনটিতে তাঁর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা দেখানো প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ের টান থেকেই আসে।
মূলত নবীর মহান আদর্শকে নিজের জীবনে মেনে চলার প্রতিশ্রুতি নেওয়া এবং তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠানোর জন্যই এই দিনটি স্মরণ করা হয়। মানুষ এই দিনে জিকির-আজকার, দরুদ পাঠ, আলোচনা সভা ও দান-সদকার মাধ্যমে প্রিয় নবীর প্রতি তাদের অগাধ প্রেম প্রকাশ করে থাকেন। বলতে গেলে, নবীজীকে ভালোবেসে এবং তাঁর দেখানো সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার জন্যই মূলত দিনটি পালন করা হয়।

২০২৬ সালের ঈদে মিলাদুন্নবী কত তারিখে ও সরকারি ছুটি কবে?

২০২৬ সালে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত হবে (চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে)। হিজরি ১৪৪৮ সালের ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে এই প্রতি বছরের মতো এবারও দিনটি বাংলাদেশে ধর্মীয় মানুষদের সাথে পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

পালন করার সঠিক তারিখ: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি বছর ২৬ আগস্ট থেকে রবিউল আউয়াল মাস গণনা শুরু হয়েছে। হিজরি ১২ রবিউল আউয়াল অর্থাৎ আগামী ৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হবে।

সরকারি ছুটির বিস্তারিত: সরকারি ক্যালেন্ডারে প্রথমে ৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) ছুটি নির্ধারিত থাকলেও চাঁদ দেখা সাপেক্ষে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) সারাদেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ছুটির দিনে সবাই পরিবার ও প্রিয়জনদের সাথে নিয়ে এই পবিত্র দিনের আমল ও বয়ান শোনার পূর্ণ সুযোগ পাবেন।

ছুটি ও আমলের সুযোগ: যেহেতু শনিবার সরকারি ছুটি থাকবে, তাই এই পবিত্র দিনে সাধারণ মানুষ এবং চাকরিজীবীরা কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই ধর্মীয় মানুষদের সাথে এবাদত-বন্দেগিতে অংশ নিতে পারবেন। দিনটিতে দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।

পবিত্র কুরআনের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর তাৎপর্য

কুরআনের আলোকে নবীজীর আগমনের আনন্দ ও তাৎপর্য: কুরআন মজিদে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর নিয়ামত ও রহমত পাওয়ার পর আনন্দ প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে (১১ নম্বর পারা) আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বলেছেন: "বল, আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর রহমতে, সুতরাং এতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটা তারা যা সঞ্চয় করে তা অপেক্ষা উত্তম।"

ইসলামিক গবেষক ও বড় বড় আলেমদের মতে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত। কারণ সূরা আল-আনবিয়া-এর ১০৭ নম্বর আয়াতে (১৭ নম্বর পারা) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: "আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।" তাই আলেমদের মতে, এই সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত প্রাপ্তির দিনে আনন্দ প্রকাশ করা এবং তাঁর আগমনের শুকরিয়া আদায় করা সরাসরি কুরআনের বার্তার সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ।

প্রিয় নবীজী (সা.)-এর জন্মের ঐতিহাসিক সময়কাল: ইতিহাসের পাতায় উল্লেখ আছে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরবি রবিউল আউয়াল মাসে আগমন করেন। অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের বছরটি ইতিহাসের পাতায় 'আমুল ফিল' বা 'হস্তী বর্ষ' হিসেবে পরিচিত।

কারণ সেই বছরেই ইয়েমেনের বাদশা আবরাহা মক্কার পবিত্র কাবা শরীফ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিশাল হস্তী বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেছিল, যা মহান আল্লাহ অলৌকিক উপায়ে আবাবিল পাখির মাধ্যমে ধ্বংস করে দেন। এর কিছুদিন পরই প্রিয় নবীজীর আগমন ঘটে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উৎসবের সূচনা: নবীজী (সা.)-এর যুগে বর্তমান সময়ের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি নির্দিষ্ট উৎসব হিসেবে পালনের প্রচলন ছিল না। সাহাবিগণ প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ নবীজীর সুন্নাহ ও ভালোবাসায় নিজেদের বিলিয়ে দিতেন। তবে ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়, হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে (আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে) আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রচলন শুরু হয়।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ইরাকের ইরবিল শহরের শাসক সুলতান মুজাফফরউদ্দীন কুকবুরী (রহ.) প্রথম বিশাল পরিসরে ও উৎসবমুখর পরিবেশে সরকারিভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের সূচনা করেন। তিনি বিখ্যাত আলেমদের দাওয়াত করতেন, গরীবদের খাবার খাওয়াতেন এবং নবীজীর জীবনী আলোচনা করতেন।

আলেমদের চোখে এই ইতিহাস ও সামাজিক তাৎপর্য: ইসলামি বিশেষজ্ঞ ও আলেমদের মতে, এই উদযাপনের মূল লক্ষ্য কোনো অশালীন উৎসব নয়, বরং ঐতিহাসিক এই দিনটিকে স্মরণ করে মানুষের মাঝে ইসলাম ও নবীজীর আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া। আল্লামা ইবনে কাছীর ও ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর মতো বিখ্যাত মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন, যে কাজে দ্বীনের ক্ষতি হয় না এবং নবীজীর প্রতি দরুদ ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

এমন যেকোনো ভালো উদ্যোগ প্রশংসনীয়। যখন সমাজে মানুষ নবীজীর ইতিহাস ভুলে যেতে বসেছিল, তখন এই মিলাদুন্নবীর ঐতিহাসিক সুচনা মানুষকে নতুন করে রাসুল (সা.)-এর মহিমান্বিত জীবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে।

কুরআনে অন্যান্য নবীদের মিলাদ বা স্মরণের প্রমাণ: কুরআন মজিদে শুধু বিশ্বনবী (সা.) নন, অন্যান্য নবীদের জন্মদিনের কথাও সম্মানের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন সূরা মারইয়াম-এর ১৫ নম্বর আয়াতে (১৬ নম্বর পারা) হযরত ইয়াহইয়া (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে: "তাঁর প্রতি শান্তি, যে দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, যে দিন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং যে দিন জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থাপিত হবেন।"


একইভাবে সূরা মারইয়াম-এর ৩৩ নম্বর আয়াতে হযরত ঈসা (আ.) নিজের জন্মদিনের শান্তির কথা উল্লেখ করেছেন। আলেমগণ ব্যাখ্যা করেন, যদি পূর্ববর্তী নবীদের জন্মের দিন কুরআনে শান্তিময় ও সম্মানিত হিসেবে ঘোষণা হতে পারে, তবে আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের দিনটি উম্মতের কাছে আরও অনেক বেশি আবেগ, শ্রদ্ধা ও গুরুত্বের দাবি রাখে।

বিশ্বের কোন কোন দেশে এবং কত সাল থেকে মিলাদুন্নবী পালন করা হয়?

মিশর ও উত্তর আফ্রিকা (ফাতিমী আমল - আনুমানিক ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দ / ৩৬২ হিজরি): ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে প্রাচীন দলিল অনুযায়ী, সরকারি বা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রথম মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রচলন দেখা যায় মিশরে। ফাতিমী খিলাফতের সময়ে, বিশেষ করে খলিফা আল-মুইজ লি-দ্বীনিল্লাহ-এর শাসনামলে (আনুমানিক ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) কায়রোতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে মিলাদ পালন শুরু হয়।

তখন খলিফা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মিসকিনদের মাঝে বিশেষ মিষ্টি ও খাবার বিতরণ করতেন। আজ পর্যন্ত মিশরে ঈদে মিলাদুন্নবী এক বিশাল উৎসবের রূপ নিয়ে পালিত হয় এবং সেখানকার ঐতিহ্যবাহী "হালওয়াত আল-মৌলিদ" (মিলাদের মিষ্টি) অত্যন্ত বিখ্যাত।

ইরাক ও সিরিয়া (আব্বাসীয় ও সেলজুক আমল - আনুমানিক ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দ / ৬০৪ হিজরি): ফাতিমীদের পর সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ও সুন্নি আলেমদের সমর্থনে বিশাল পরিসরে মিলাদুন্নবী পালন শুরু হয় ইরাকের এরবিল শহরে। ইরাকের শাসক সুলতান মুজাফফরউদ্দীন কুকবুরী (রহ.) ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সুফি সাধক ও বড় বড় আলেমদের নিয়ে সরকারিভাবে এই উৎসবের আয়োজন করেন।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ.) লিখেছেন, সুলতান মুজাফফর প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আলেমগণ আসতেন এবং তিনি হাজার হাজার পশু জবাই করে সাধারণ মানুষকে আপ্যায়ন করাতেন।

তুরস্ক ও উসমানীয় সাম্রাজ্য (১৫৮৮ খ্রিষ্টাব্দ): উসমানীয় (ওটোমান) সাম্রাজ্যে ১৫৮৮ সালে সুলতান মুরাদ (তৃতীয়)-এর শাসনামলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদে মিলাদুন্নবীকে রাজকীয় ও সরকারি উৎসব হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এই দিনে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বড় বড় মসজিদগুলোতে (যেমন ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ মসজিদ) বিশেষ মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকসজ্জা করা হতো। সেই থেকে তুর্কি ভাষায় এই রাতটিকে "কানদিল" (Kandil) বলা হয়। আজও তুরস্কে এই দিনে বিশেষ মোনাজাত, দোয়া ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে অত্যন্ত জমকালোভাবে দিনটি পালন করা হয়।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান (দক্ষিণ এশিয়া - ষোড়শ শতাব্দী থেকে বর্তমান): ভারতবর্ষে মোগল ও সুলতানি আমলে সুফি-সাধক এবং পীর-বুজুর্গদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে মিলাদুন্নবীর প্রসার ঘটে। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে (বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীন হওয়ার পর) দক্ষিণ এশিয়ায় দিনটি আরও ব্যাপকতা পায়।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে ঈদে মিলাদুন্নবীকে সরকারি সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় বিশাল 'জুলুস' (শান্তিপূর্ণ র্যালি) ও জশনে জুলুস বের করা হয়, যা গাউসিয়া কমিটি ও অন্যান্য দরবার কর্তৃক কয়েক দশক ধরে মহাসমারোহে পালিত হয়ে আসছে।

ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া - পঞ্চদশ শতাব্দী): দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যখন আরব বণিক ও সুফিদের মাধ্যমে ইসলামের আগমন ঘটে (১৪-১৫ শতক), তখন থেকেই সেখানে মিলাদুন্নবী পালনের সংস্কৃতি চালু হয়। ইন্দোনেশিয়ায় এই উৎসবকে বলা হয় "মৌলিদান" বা "গ্রেবেগ মৌলুদ"।

সেখানকার জাভা ও ইয়োগিয়াকার্তার রাজপরিবার শত শত বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা ও তোবারক বিতরণের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করে আসছে। মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়েও দিনটিতে রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে এবং রাজপরিবারের সদস্যরা এসব মিলাদ মাহফিলে অংশ নেন।

ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য অমুসলিম দেশ: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় (১৯৫০-১৯60-এর দশক) থেকে যখন এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলমানরা ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় হিজরত করতে শুরু করেন, তখন থেকে সেসব দেশেও মিলাদুন্নবী পালন শুরু হয়। যুক্তরাজ্য এর বার্মিংহাম, লন্ডন এবং ম্যানচেস্টারে প্রবাসী মুসলিমরা গত কয়েক দশক ধরে মিলাদুন্নবীর মিছিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করে আসছেন।
ঈদে-মিলাদুন্নবী

ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপন কীভাবে এবং কেন করা উচিত?

কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আজকারের মাধ্যমে শুরু: এই পবিত্র দিনের শুরুটা হওয়া উচিত ফজরের নামাজের মাধ্যমে। সারাদিন পবিত্র আল-কুরআন তেলাওয়াত, বেশি বেশি ইস্তিগফার এবং মহান আল্লাহর জিকিরে নিজেকে মগ্ন রাখা উচিত। এটি হৃদয়ে প্রশান্তি আনে এবং মহান আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ককে আরও গভীর করে।

দরুদ ও নামায আদায় করা: আমাদের প্রিয় নবীজী (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়া অত্যন্ত ফজিলতের একটি কাজ। আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন নবীজীর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠাতে। তাই এই বিশেষ দিনে কাজ-কর্মের পাশাপাশি বা অবসর সময়ে বেশি বেশি 'সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম' বা 'দরুদে ইব্রাহিম' পাঠ করা উচিত।

রোজা রাখার সুন্নাহ: আমাদের নবীজী (সা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি কেন প্রতি সোমবার রোজা রাখেন, তখন তিনি বলেছিলেন-এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর প্রথম ওহী বা কোরআন নাজিল হয়েছে। তাই প্রিয় নবীজীর আগমনের শুকরিয়া জানাতে এই দিনে নফল রোজা রাখা সওয়াবের কাজ এবং এটি সরাসরি নবীজীর সুন্নাহ।

সীরাত আলোচনা ও ওয়াজ মাহফিল: প্রিয় নবীজী (সা.) কেমন ছিলেন, মানুষের সাথে তাঁর ব্যবহার কেমন ছিল, তিনি কীভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এসব বিষয় নিজেরা পড়া এবং পরিবার ও সন্তানদের জানানো অত্যন্ত জরুরি। মসজিদে বা ঘরে ঘরে সীরাতুন্নবী (সা.) বা নবীজীর জীবনী নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা উচিত, যাতে নতুন প্রজন্ম মহানবী (সা.)-এর আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারে।

দান-সদকা ও মিসকিনদের খাবার খাওয়ানো: নবীজী (সা.) ছিলেন সৃষ্টির জন্য রহমত। তিনি এতিম, মিসকিন ও অসহায়দের সবসময় সাহায্য করতেন। তাই এই আনন্দের দিনে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র, এতিম ও প্রতিবেশীদের মাঝে ভালো খাবার বিতরণ করা, তাদের জামাকাপড় বা আর্থিক সাহায্য করা অত্যন্ত উত্তম একটি কাজ।

পারিবারিক ও সামাজিকভাবে আনন্দ প্রকাশ: ইসলামের সীমার ভেতরে থেকে এই দিনে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি (আতোর) ব্যবহার করা এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো খাবার খাওয়া ও আনন্দ ভাগাভাগি করায় কোনো বাধা নেই। তবে মনে রাখতে হবে, আনন্দের নামে কোনো ধরনের অশালীন আচরণ বা উচ্চশব্দে গান-বাজনা করা একদম অনুচিত না।

ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসসমূহ

জন্মদিনের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের আমল (সহিহ মুসলিম): হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত একদা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবার দিনে রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি উত্তরে বললেন: "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়েছে।"(সহিহ মুসলিম: ৮৯৫)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, প্রিয় নবীজী (সা.) নিজের জন্মের দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং এই মহান নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে প্রতি সপ্তাহের সোমবারে রোজা রাখতেন।

রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার ঈমানী শর্ত (সহিহ বুখারি): হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন: "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হব।" (সহিহ বুখারি: ১৫)নবীজী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা ঈমানের মূল ভিত্তি। তাই তাঁর আগমন বা মিলাদ স্মরণ করার মূল উদ্দেশ্যই হলো হৃদয়ে নবীজীর প্রতি ভালোবাসা।

দরুদ পাঠের ফজিলত (তিরমিজি ও নাসায়ি): হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী ব্যক্তি সেই হবে, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করে।" (জামে আত-তিরমিজি: ৪৮৪) মিলাদুন্নবীর অন্যতম প্রধান আমল হলো বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। যে ব্যক্তি যত বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করবে, আখেরাতে নবীজীর শাফায়াত পাওয়ার সৌভাগ্য তার তত বেশি হবে।

শেখ আহমাদুল্লাহসহ সমসাময়িক দায়িত্বশীল ইসলামি আলোচকগণ হাদিসের আলোকে বিষয়টিকে অত্যন্ত সুসংহত ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন:
  • সুন্নাহসম্মত শুকরিয়া আদায়: শেখ আহমাদুল্লাহ তাঁর আলোচনায় প্রায়শই উল্লেখ করেন যে, রাসুল (সা.)-এর আগমন মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত। তবে সেই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের সবচেয়ে সঠিক ও সুন্নাহসম্মত উপায় হলো নবীজী নিজে যেভাবে করেছেন। অর্থাৎ, সোমবারের রোজা রাখা, বেশি বেশি দরুদ শরীফ পড়া এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ ও সীরাত নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করা।
  • সীমা লঙ্ঘন ও বেদআত থেকে বেঁচে থাকা: আলেমদের মতে, প্রিয় নবীজীর আগমনকে কেন্দ্র করে আনন্দ প্রকাশ করা বা তাঁর জীবনী আলোচনা করা ভালো কাজ। তবে রাসুল (সা.) বা সাহাবিদের যুগে যা ছিল না, এমন কোনো শরিয়তবিরোধী কাজ (যেমন: অশালীন র্যালি, উচ্চশব্দে গান-বাজনা, কিংবা সালাত-সালামের নামে হইচই) করা যাবে না।
  • মূল উদ্দেশ্য সীরাত চর্চা: আলেমদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো কেবল বছরে একদিন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সারা বছর নবীজীর প্রতিটা সুন্নাহকে নিজের ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক জীবনে মেনে চলাই হলো একজন প্রকৃত নবীর আশিকের মূল পরিচয়।

ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা জায়েজ কি না?

জায়েজ ও সওয়াব মনে করা আলেমদের মতামতঃ ইমাম সুয়ূতী ও ইবনে হাজার আসকালানীর মতো ফকিহদের মতে, শরিয়তের সীমা বজায় রেখে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা জায়েজ এবং মোস্তাহাব। তাঁদের যুক্তি হলো কুরআনে আল্লাহর রহমত ও নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের নির্দেশ রয়েছে, আর বিশ্বনবী (সা.) হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত। তাই শরিয়তবিরোধী কাজ ছাড়া কেবল দরুদ পাঠ, সীরাত আলোচনা ও গরিবদের খাবার খাওয়ানো উত্তম কাজ।

না-জায়েজ ও বেদআত মনে করা আলেমদের মতামতঃ অন্যদিকে সালাফি ও দেওবন্দি ঘরানার আলেমদের মতে, এই দিনটিকে উৎসব হিসেবে নির্দিষ্ট করে পালন করা জায়েজ নয়। তাঁদের মূল বক্তব্য রাসুল (সা.) কিংবা সাহাবিদের যুগে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি পালনের কোনো প্রমাণ নেই। নবীজীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সঠিক উপায় হলো প্রতি সোমবারে রোজা রাখা এবং প্রতিদিন তাঁর সুন্নাহ পুরোপুরি মেনে চলা।

শরিয়তের মূল সিদ্ধান্ত ও আমলঃ মূলকথা হলো, উদ্‌যাপনের নামে যদি অশালীনতা, বাজনা বা কোনো হারাম কাজ যুক্ত হয়, তবে তা নিষিদ্ধ। তবে কোনো মনগড়া প্রথা ছাড়া কেবল নবীজী (সা.)-এর পবিত্র জীবন আলোচনা করা, দরুদ শরীফ পাঠ এবং আল্লাহর জিকির করার মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করলে তাতে কোনো শরিয়তি বাধা নেই।

বিশ্বনবী (সা.)-এর আগমন ও ঐতিহাসিক পেছনের কথা

আইয়ামে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগের বিভীষিকা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আগমনের পূর্বে গোটা আরব বিশ্ব ঘোর অন্ধকার, কুসংস্কার ও বর্বরতায় নিমজ্জিত ছিল, যাকে ইতিহাসে 'আইয়ামে জাহিলিয়াত' বলা হয়। সে যুগে সমাজে ন্যায়-ইনসাফ বলতে কিছুই ছিল না, গোত্রে গোত্রে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে চলত। অন্যায়, ব্যভিচার, মদ্যপান ও জোর-জুলুমই ছিল তখনকার সমাজের সাধারণ চিত্র।

নারী ও এতিমদের করুণ দশা: তৎকালীন সমাজে নারীদের কোনো সম্মান বা অধিকার ছিল না, এমনকি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। এতিম, দাস ও অসহায় মানুষের ওপর চলত অমানুষিক নির্যাতন ও শোষণ। মহান আল্লাহর একত্ববাদ ভুলে গিয়ে মানুষ কাঠ, পাথর ও মাটির তৈরি শত শত দেব-দেবীর পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।

বিশ্বনবীর আগমন ও আলোর দিশা: এমন এক সংকটময় ও অরাজক মুহূর্তে পরম করুণাময় আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে এই পৃথিবীতে আগমন করেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি এসে অন্ধকার দূর করে সত্য, ন্যায়, শান্তি এবং মানবমর্যাদার এক অভূতপূর্ব বার্তা উপহার দেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক আগমনের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী এক নতুন জীবন ও সঠিক হেদায়েতের পথের দিশা পায়।
ঈদে-মিলাদুন্নবী

জশনে জুলুস কী এবং ঈদে মিলাদুন্নবীতে এর প্রচলন কীভাবে শুরু হলো?

জশনে জুলুসের সাধারণ অর্থঃ 'জশন' শব্দের অর্থ আনন্দ আর 'জুলুস' অর্থ মিছিল বা যাত্রা। সহজ কথায়, 'জশনে জুলুস' বলতে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভ আগমন উপলক্ষে আনন্দ র‍্যালি বা শোভাযাত্রাকে বোঝানো হয়। এই শোভাযাত্রায় সাধারণত মুসলমানরা সুশৃঙ্খলভাবে হেঁটে বা যানবাহনে চড়ে হামদ, গজল, দরুদ ও সালাম পাঠ করতে করতে রাজপথে আনান্দ মিছিল করেন এবং নবীজীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন।

ইতিহাসের পাতায় জশনে জুলুসের সূচনাঃ ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মক্কা থেকে হিজরত করে নবীজী (সা.) যখন প্রথম মদিনায় পৌঁছান, তখন মদিনাবাসী তবল বাজিয়ে ও আনন্দ গান গেয়ে তাঁকে বরণ করে নিয়েছিলেন। সেখান থেকেই মূলত আনন্দের সাথে শোভাযাত্রা বা অভ্যর্থনার ধারণা তৈরি হয়। তবে আধুনিককালে সুবিশাল আকার ও সরকারি আয়োজনে প্রথম জশনে জুলুস পালন শুরু হয়েছিল ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইরাকের এরবিল শহরের শাসক সুলতান মুজাফফরউদ্দীন কুকবুরী (রহ.)-এর হাত ধরে।

দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশে জশনে জুলুসঃ দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামে সুফি আল্লামা তৈয়্যব শাহ (রহ.) প্রথম বিশাল পরিসরে 'জশনে জুলুস' চালু করেন। যা বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় জশনে জুলুসে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ আশেকে রাসুল অংশ নেন। আলেমদের মতে, এটি যদি শান্তিময়, শরিয়তের সীমা মেনে এবং জিকির-দরুদের সাথে বের করা হয়, তবে তা প্রশংসনীয়।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) থেকে আমাদের মূল শিক্ষা

নবীজীর ভালোবাসায় জীবন গড়াঃ ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের মূল সার্থকতা কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা, র‍্যালি বা আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের প্রতিটি ভালো গুণ ও সুন্নাহকে নিজের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও কর্মজীবনে আমল করাই হলো এই দিনের আসল বার্তা।

সমাজে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাঃ বিশ্বনবী (সা.) সারা জীবন সত্য, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি এতিম, অসহায় ও গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন। তাই এই দিনে তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম বড় উপায় হলো সমাজের অসহায় মানুষের সাহায্য করা এবং পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে শান্তির সমাজ গড়ে তোলা।

সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশঃ সবশেষে, একজন খাঁটি মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত প্রতিদিন প্রিয় নবীজী (সা.)-এর সুন্নাহ মেনে চলা এবং বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা। নবীজীর দেখানো সঠিক পথে জীবন পরিচালিত করার মাধ্যমেই আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে মহান আল্লাহ তাআলার রহমত ও মাগফিরাত লাভ করতে পারব।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্নঃ মিলাদ শব্দের অর্থ কি?
উত্তরঃ 'মিলাদ' একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ জন্ম, জন্মসময় বা জন্মবৃত্তান্ত।

প্রশ্নঃ ঈদ-উল-মিলাদ উন নবী কি?
উত্তরঃ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন বা জন্ম উপলক্ষে শ্রদ্ধা ও আনন্দ প্রকাশ করাকে ঈদ-উল-মিলাদ উন নবী বলা হয়।

প্রশ্নঃ ২০২৬ সালে মিলাদুন নবী কবে?
উত্তরঃ চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের ৫ বা ৬ সেপ্টেম্বর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত হওয়ার কথা ছিল (যা পরবর্তীতে ৬ সেপ্টেম্বর সরকারিভাবে নির্ধারিত হয়)।

প্রশ্নঃ ঈদে মিলাদুন্নবী কি সাধারণ ছুটি?
উত্তরঃ হ্যাঁ, বাংলাদেশে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাধারণ ছুটি থাকে।

প্রশ্নঃ ঈদে মিলাদুন্নবী জায়েজ কি না?
উত্তরঃ শরিয়তের সীমা মেনে দরুদ পাঠ, সীরাত আলোচনা ও দান-সদকার মাধ্যমে পালন করাকে একদল আলেম জায়েজ মনে করেন, তবে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট উৎসব বানানোকে অন্য দল না-জায়েজ বলেন।

প্রশ্নঃ ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে হাদিস কি বলে?
উত্তরঃ রাসুল (সা.) প্রতি সোমবারে রোজা রেখে নিজের জন্মদিনের শুকরিয়া প্রকাশ করতেন (সহিহ মুসলিম)। এছাড়া নবীজীকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসার নির্দেশ হাদিসে এসেছে।

প্রশ্নঃ ইসলামে কি মিলাদের অনুমতি আছে?
উত্তরঃ দরুদ পাঠ, জিকির ও নবীজীর জীবনী আলোচনার উদ্দেশ্যে মিলাদ আয়োজনে বাধা নেই, তবে এতে কোনো অপসংস্কৃতি বা অনৈসলামিক কাজ যুক্ত করা যাবে না।

প্রশ্নঃ ঈদে মিলাদের ইতিহাস কি?
উত্তরঃ নবীর যুগে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি না থাকলেও হিজরি চতুর্থ শতকে ফাতিমী শাসনামলে এবং পরবর্তীতে সপ্তম শতকে রাজা মুজাফফরউদ্দীন কুকবুরী সরকারিভাবে ব্যাপক উৎসবের সূচনা করেন।

প্রশ্নঃ মিলাদ মাহফিল কি?
উত্তরঃ যে ধর্মীয় সভায় সমবেত হয়ে প্রিয় নবী (সা.)-এর পবিত্র জীবনী আলোচনা করা হয়, দরুদ ও সালাম পাঠ করা হয় এবং দোয়া অনুষ্ঠিত হয়, তাকে মিলাদ মাহফিল বলে।

প্রশ্নঃ মিলাদ পড়া বা দুরুদ মাহফিল কি?
উত্তরঃ একা বা দলবদ্ধভাবে নবীজী (সা.)-এর ওপর দরুদ শরীফ পাঠ করা এবং তাঁর প্রশংসাগীতি বা 'নাাত' পরিবেশন করার আমলকেই সহজ কথায় মিলাদ বা দরুদ মাহফিল বলা হয়।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সর্ম্পকে লেখকের শেষকথা

ঈদে মিলাদুন্নবী বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অনুভূতির দিন। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র আগমন মানবজাতিকে অন্ধকারের পথ থেকে আলো ও হেদায়েতের পথ দেখিয়েছে। তাই এই দিনে অযথা তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী রাসুল (সা.)-এর জীবনের শিক্ষা, সুন্নাহ এবং মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করা প্রতিটি মুসলিমের উচিত।

আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি উদযাপনের চেয়েও বড় বিষয় হলো বিশ্বনবীর আদর্শকে নিজেদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ধারণ করা। প্রতিদিন নিয়মিত দরুদ ও সালাম পাঠ করা, সোমবারে নফল রোজা রাখা, এতিম ও দরিদ্রদের সাহায্য করা এবং নবীজীর প্রতিটি সুন্নাহ মেনে চলার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। আশা করি বিস্তারিত আলোচনার পর আপনাদের বুঝতে সুবিধা হয়েছে ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
1 জন কমেন্ট করেছেন ইতোমধ্যে
  • Kk
    Kk ৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:৩৭ PM

    অনেক সুন্দর লিখেছেন

মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

টিপস পয়েন্ট আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url